গাটছড়া বাঁধা

তবে ওদের সাথেই আমার গোটা জীবনের
গাটছড়া বাঁধা আজীবন

তেতলা বাড়ির ছাদে মহড়ায়
আজও দেখি: আমি বসে আছি অপেক্ষায় সুশান্তের;
বড় ছটপটে এবং চটপটে, শত কাজ সেরে বা ফেলে রেখে
সে আসবেই রিহার্সেলে সাঝে লাস্ট ট্রেনে ফিরে যাবে
নাটক করা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই তার জীবনে।
নাটক করে, ডাক্তারি পড়ে, কবিতা লিখেও
প্রেম করবার সময় করে নিয়েছে দু-তিনটে প্রতিবারে আমিনুল
ওর হাত ধরেই চিনেছিলাম প্রসেনিয়াম
ওর মানিব্যাগ এবং মন বরাবরই ছিল আমার জন্যে খোলা
ঘরের দরজাও, যখন তখন আড্ডা, সকাল থেকে সাঝ বারো মাস।
অসম্ভব মেধাবী চেহারা ধারী চাপা কন্ঠের পলাশ
ভাবতাম, ও যে জীবনে কত বড় হবে — চে নাকি ত্রোৎস্কি
ইয়ার্কি মেরে বললেও জানতাম, সে যে কবি বা কবিতা নয়,
ভুরী ভুরী ছবির মতোই ভারি গদ্য — গের্নিকা
আর একেবারে সূর্যমুখি ফুলের মতোই সদাহাস্য
অনুপম, সেই আমাদের হালবিনা নাও কালেই চাকুরিজীবী
দুয়েকজনতো আবার দেশের বিধায়ক, তখনও বোঝা যায় নি
ওরা এমন সহজ পেশা বেছে নেবে
সবাই আজ ফেসবুকে —
একাডেমি চত্বরে বসে চা সিগারেট আর কাপে কাপে আড্ডা

ত্রিশটা বছর! নাকি, তিনশ বছর
সবার সন্ততি জন্মদিন সানাই কেক মোমবাতী
কেউ কেউ এসে বসলো না ফেসবুকের মহা ‘কফি-হাউসে‘
আর কে কে যেন হারিয়ে গেছে কোথাও
তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় নি
আর কাকে কাকে তো যেন খঁজে দেখাও হয় নি
এই ছোট হয়ে আসা জনবহুল পৃথিবীতে
মনের অজানতে চাপা পড়ে গেছে তারা হৃদয় খাঁদারে

সূর্যাস্ত / এফি লী নিউসাম

যেহেতু কবিরা সব গেয়ে গেছেন সূর্যাস্তের গান
কী বা আর রয়ে গেছে বাকি শোনাবো আজ
আমি দেখেছি শুধু অতি সাধারন দিনমান
রাঙ্গা ঠোটে জাপটে ধরেছে ধূসর দিগন্তকে
চুম্বন করে চলেছে বিশ্বটাকে বিদায় বেলায়

বারবারা / জাক প্রেভের

মনে পড়ে বারবারা
ব্রিস্টে সেদিনটাতে বৃষ্টি হয়েছিল নিরন্তর
তুমি চলে গেলে হেসে হেসে
দীপ্ত, মোহনীয়, ভিজে জবজবে
বৃষ্টিতে।
মনে পড়ে বারবারা
অঝোরে বৃষ্টি সেদিন নিরন্তর ব্রিস্টে
সিয়াম স্ট্রিটে আমি গিয়েছি ছুটে তোমার কাছে
তুমি তাকালে হাসি হাসি মুখে
আমিও হেসেছিলাম।

মনে পড়ে বারবারা
তোমায় আমি চিনতাম না মোটেই
তুমিও কী চিনতে আমাকে,
মনে পড়ে,
আজও মনে পড়ে দিনটা স্পষ্ট
ভুলি নি এক চুলও
এক ভদ্রলোক বারান্দায় বেরিয়ে এসে কোনো মতে
চিৎকার করে ডাকছে তোমাকে
বারবারা,
আর, সেই বৃষ্টি মাথায় এক দৌড়ে তুমি চলে গেলে
দীপ্ত, মোহনীয়, ভিজে জবজবে
তুমি গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছ তার বাহুডোরে

বারবারা মনে পড়ে সে কথা
রেগে উঠো না যদি কিছু অবাধ কথা বলি,
আমি সচরাচর অবাধেই কথা বলি তাদের সাথে
যাদের আমি ভালবাসি
হয়তোবা তাদের দেখেছি কেবলই একবার
আর যারা প্রেম করে তাদের সবার সাথেই আমি
অবাধেই কথা বলি
এমনকি তাদেরকে হয়তো চিনি না জানি না
মনে রেখো বারবারা
ভুলো যেও না
সেই সুমধুর সুখের বৃষ্টির কথা
তোমার চোখে-নাকে-মুখে
সেই সুখের নগরীতে,
সেই ঝর ঝর ধারা সাগরের বুকে,
অস্ত্রাগারের ছাদে
উশান্তের যোদ্ধা জাহাজে

শোনো, বারবারা
যুদ্ধ যে কী চরম বোকামি
কী হয়ে গেছে তোমার
এই অয়ময় বৃষ্টিতে
অগ্নিময়, লৌহ ও রক্তে,
আর যে তোমায় কামান্ধ বহুবন্ধনে আটকে রেখেছিল
সে কি মারা গেছে নাকি চলে গেছে অথবা এখনো বেশ
বেঁচে বর্তে আছে

বারবারা, শুনছো
আজ সারাটা দিন ব্রিস্টেতে বৃষ্টি
আগেও যেমন হতো,
তবে এ-তো আর এক নয় কোনে মতেই,
সব কিছুই ম্লান হয়ে আছে,
এ তো বৃষ্টি শোকের, ভয়ংকর এবং নির্জনতার,
না, একে এখনো ঝড় বলা যাবে না
অগ্নিময় – লৌহ ও রক্তের,
নিছকই মেঘের বৃষ্টি
কুকুরের মৃত্যু বরাতে,
কুকুর যেমন দৌড়ে পালায় আড়ালে
মুশল ধারায় ব্রিস্টের ডুবে যাওয়া জলে
ভেসে বয়ে চলে যায় ক্ষয়ে যেতে
দীর্ঘ পথ ধরে কোনো কানা গলিতে,
বহু দূর, বহু দূর ব্রিস্টে ছাড়িয়ে অনেকটা দূরে
সেখানে এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

ক্ষুদ্র এক পাহাড়ী শহর / ইয়ে লিজুন

দক্ষিণের পাহাড়ী দঙ্গলে অতি ছোট এক গ্রাম
স্পষ্টতই চারটি ঋতু আর একটা নদী চিরন্তন বয়ে যায়
বনে বাগানে লাল শিখা জ্বেলে ওঠে দিনমনি জেগে, চারিদিক আলোর ঝলক
এহেন এক ছোট্ট শহরে স্কুলের মাস্টার আমি
স্কুলের বাড়তি একটা শ্রেণিকক্ষ
তক্তাপোশ একটা, আর একটা একটা করে টেবিল চেয়ার
স্কুল শেষে, আমার নিজের ঘরবাড়ি ঐটাই
গত দশটা বছর এই সাদা সিধে পথটাই আমার জীবন।
“তবে তো অন্য কিছু করতে পারো?“ বলে অনেকে
লজ্জায় আমার গালের দুটো পাশ লাল হয়ে ওঠে, জিবে কথা আটকায়
জানি না এমন কথার উত্তরে কী বলতে হয়
আসল কথা, আমি এই নির্জন নিরালায় থেকে থেকে বুড়িয়ে যাচ্ছি
নিত্যদিনের এই চর্বিতচর্বণ জীবনে ঘেন্না ধরে গেলো
জোড়ায় জোড়ায় নির্বোধ চোখগুলো দেখে দেখে। এতটা দিনে
বুঝেছি বেশ ভালো করে, আমার নিজের বেলায়
প্রকৃত শিক্ষায় হাতে খড়ি কভু কি স্কুলে হয়

যাবৎজীবন দন্ডে

সাইত্রিশ বছর আগের প্রেম, শীলা,
তুমি তখন বড় শান্ত সর্বংসহা এক কিশোরী
প্রেমে যত অত্যাচার করা যায়
সবটুকু করেছি ঠিকই
কখনো ভাবি নি তোমাকে ছাড়াও আমার জীবন চলতে পারে
জীবন কী চলে এসেছে এতটা দূর?

বই থেকে যতবার মুখ তুলে
তাকাই জানালায়
দেখি খরতর রোদ
তাকাই দেয়ালে
সেখানে সাজানো থরে থরে বিরক্তি
আর ঘৃণা
কেউ দেখে না, ঝুলের মতো আগাছা হয়ে ঝুলে আছে
ঘরের এখানে সেখানে সর্বত্র
দরজায় দেখি
পালিয়ে বাঁচার বড় সড় বাঁধা
সে এক, একা বই
আর তাতে কালো কালো লক্ষ পিপড়ের মাঝে
ডুবে থাকি সারাক্ষণ
ভুল সুধরানো না গেলে
শাস্তি তুলে নিতে হয় নিজ হাতে
আমি লোকালয়ে বসবাস করেও
দ্বীপান্তরের শাস্তি নিয়েছি তুলে

তুমিও নিশ্চয়ই
দু-চারটে ছেলে মেয়ের রুক্ষ সুক্ষ্ম মা হয়ে
শাস্তি কাটছো যাবৎজীবন দন্ডে

ছোট শহর / জিল ওসিয়ার

শোনো, এই যে এখানে কম্বলটা ভিজে কারণ
আমি ছিলাম এখানেই। কেনো না
তোমার ঘরের দ্বার ছিল উদাম খোলা, আর আমি এখানে
এই গাছটার নিচে। ছিলাম কার‌ণ
বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল। কেনো না বৃষ্টি
এবং এই গাছটা, মানে দুটোই
তোমার বাড়ির পেছনে। কারণ, কারণ
আমি অমনই। কারণ তুমিও
ছিলে না বাড়িতে। মানে জানতান
তুমি গিয়েছো ক্লাবে। কারণ
যাচ্ছিলাম তোমারই রাস্তায়, কেনো না সে পথটা
তোমার বাড়ির পথ। আর আসল কথা
আমার একটু হাঁটার ইচ্ছে হলো। কেনো না
দেখলাম বৃষ্টি এলো বলে। কারণ তোমার বাড়ির দ্বার
কখনোই বন্ধ থাকে না।