যাবৎজীবন দন্ডে

সাইত্রিশ বছর আগের প্রেম, শীলা,
তুমি তখন বড় শান্ত সর্বংসহা এক কিশোরী
প্রেমে যত অত্যাচার করা যায়
সবটুকু করেছি ঠিকই
কখনো ভাবি নি তোমাকে ছাড়াও আমার জীবন চলতে পারে
জীবন কী চলে এসেছে এতটা দূর?

বই থেকে যতবার মুখ তুলে
তাকাই জানালায়
দেখি খরতর রোদ
তাকাই দেয়ালে
সেখানে সাজানো থরে থরে বিরক্তি
আর ঘৃণা
কেউ দেখে না, ঝুলের মতো আগাছা হয়ে ঝুলে আছে
ঘরের এখানে সেখানে সর্বত্র
দরজায় দেখি
পালিয়ে বাঁচার বড় সড় বাঁধা
সে এক, একা বই
আর তাতে কালো কালো লক্ষ পিপড়ের মাঝে
ডুবে থাকি সারাক্ষণ
ভুল সুধরানো না গেলে
শাস্তি তুলে নিতে হয় নিজ হাতে
আমি লোকালয়ে বসবাস করেও
দ্বীপান্তরের শাস্তি নিয়েছি তুলে

তুমিও নিশ্চয়ই
দু-চারটে ছেলে মেয়ের রুক্ষ সুক্ষ্ম মা হয়ে
শাস্তি কাটছো যাবৎজীবন দন্ডে

বাড়িগুলো সব উল্টে গেলো

গ্রামে দেশজ বাড়িতে, বাগান হয়ে
উঠোন পেরিয়ে বারান্দায় উঠে এসে
ঘরে ঢুকতে হতো।
শহরের ফ্ল্যাটে ড্রেন টপকে দুধাপ উঠে পার্কিংলট
তা পেরিয়ে ঘরে ঢুকে বারান্দা, বাগান

আমরা খেলতে ছুটতাম বাইরে, মাঠে
ওরা জায়গাটাকে ফাঁকা রেখে
ঘরের ভেতরেই পাঠিয়ে দিয়েছে মাঠটাকে
বাচ্চারা আজ বেদম ছোটে এবং ছোটায় ভারচুয়াল গাড়ি
বাস্তবে, কেউ ওখানে তুলছে বাড়ি বা শপিং মল

শহর, মানে মাথা গোঁজার জায়গাও বটে
তবে করে খাওয়ার পথটাই আগে

লিপোর দুটো কবিতা

বৃষ্টি শেষে চাঁদের রূপ দেখে

জমাট কালো মেঘ ভেঙ্গে বাতাস ছুটেছে ঐ
আরো একবার চোখে পড়ে বিস্তর দিগন্ত নগরীর পিছে চৌদিক
খোলো দরজা। চাঁদের বুড়ি বেরিয়ে এসেছে আধা পথ
তার ঝিলিক, কোমল দধির ছড়িয়ে আকাশময়
নদীগুলোসব নাবাল জলাভূম চিক চিকে অলঙ্কার
চাঁদ, উঠছে, যেন পাহাড়ের স্বেত চক্ষু
মাথার উপরে এসে সে সাগরের হৃদপিন্ড
আসল কথা, আমি চাঁদ বড় ভালবাসি, ঐ গোলপানা চাঁদ
গুন গুনিয়ে গান করি জেগে সারা রাত

গ্রীষ্মের একদিন পাহাড়ে

আলতো দোলায় নাড়ছি আমি পালক পাখা
জামা খুলে বসে আছি সবুজ বনে
মাথাল খুলে ঝুলিয়ে দিলাম কাল পাথরে
পাইন-গাছের বাতাস এসে দোলে আমার
আদুল মাথায়

মিঠা পানির নদী

প্রতিটা সাগর, উপসাগরই আসলে নিছক একেকটা ‍হ্রদ, বিশাল
যদি না সাগর বা মহাসাগরের সাথে তার কোনো সংযোগ থাকে
নেহায়েত একটু সংযোগ আর লবনাক্ততা
মানুষগুলো তাই অন্য কোনো গুনাগুন নয়
লবন খোঁজে লবন আর মাথার উপর
সাগর, মহাসাগরের হাত
কুল কিনারা থাক বা না থাক, দেখা যাক বা না যাক
তুমি সোজা এঁকে বেঁকে গড়িয়ে এসে পড়লেই কিন্তু
তুমি নদী। আর আমি নদী হয়ে থাকতেই ভালবাসি
কুলু কুলু বয়ে যাওয়া মিঠা পানির নদী
বকশি বাড়ির ঘাট, পাকশীর ব্রিজ, গোয়ালন্দ ডুবিয়ে যাওয়া
কেওড়াতলার শ্মশান আর মঠবাড়ি মুন্সিদের গোরস্থান ভিজিয়ে যাওয়া নদী।
খোদার কসম, সাগর নয় উপসাগরও নয়
আমি পড়ে থাকতে চেয়েছি নদী বা কেবলই একটা খাল হয়ে;
বাড়ির মেয়ে-বউ জল নিয়ে যাবে, ছেলে ছোকড়ারা ডিগবাজি খাবে
জেলেরা মাছ ধরে নিয়ে, বাজারে বেচে বেচে
আইবুড়ো মেয়েটার বিয়ে দেবে।
কেউ কেউ বেয়ান বেলায় ওজু করে আমার ঘুম তাড়াবে
সূর্য প্রনাম করে আমায় গায়-গতরে রোদ মাখাবে।

অথৈ জলে এসব কোথায়? সমাজ ছেড়ে পড়ে থাকা সাগর হয়ে!

হাট বসেছে, আমি না হয় নালা-ই হলাম
হে প্রভু, সব দিয়েছো, তবু ভাবি, আর একটু যদি ব্যাপ্তি দিতে!
যা দিয়েছো খুব দিয়েছো, বয়ে চলেছি, নির্জনে নয়, নিরবধি লোকালয়ে
তোমার আরও আর কি-ই বা আছে, চাইতে হবে কোঁচড় পেতে!

তৃতীয় প্রজন্মে এসে

কোকিলের ডাক শুনি ঘরে বসে শহরেই
বৈশাখের বাতাস জানালা ফুঁড়ে এসে লাগে ঘাড়ে গর্দানে
শুনেছি আমাদেরও একটা গ্রামীন জীবন ছিল তিন প্রজন্ম আগেই
দাদাজান এই যে চারতলা বাড়িটা করেছিলেন এখানে
শহরে, সস্তায় পাওয়া দুকাঠা জমির উপর, এখন
নিজেদের থাকবার চারখানা রুম; বাকিটা ভাড়াটিয়া

এই চারটে রুমই ভুলিয়ে রেখেছে আমাদের
মধুমতী নদী ঘেসে গ্রামটা আর সেখানে
চার বিঘা জমিতে পড়ে থাকা চুন-সুরকীর দোতলা দালান
এবং এক বিধবা চাচাতো ভাবি
ভেঙ্গে পড়ছে ধীরে ধীরে

দাদাজান বলতেন, “আহারে যদি ফিরে যেতে পারতাম
পায়ের এই শৃঙ্খলটা ছিড়ে ফেলে!“

গ্রামে গিয়েছি দুচারবার, বিদেশ ভ্রমনের মতো
কোকিলের ডাক, পাখিদের কিচির মিচির আর
সেই ব্যাথা –শৃঙ্খল ছেড়বার ইচ্ছেটা
শুধু ঐ ইচ্ছে টুকুতেই বেঁচে আছে আমার গ্রাম
আমার বুকে।

চাকুরির সুবাদে

শত বছর আগেও
গ্রামে বসে আমাদের পূর্বজ জানতো কী
তাঁদের সন্তানেরাও বসবাস গড়বে ইউরোপে!

আজ তাই আমিও জানি না, হয়তো
আমারই উত্তর পুরুষের কেউ কেউ
গিয়ে থাকবে চাঁদে বাড়ি ভাড়া করে
চাকুরির সুবাদে।