আইসোলেশনে কথোপকথন / হ্যারিয়েট মুলেন

পাশের বাড়ির মানুষ পেরেক ঠুকে কাঠে
তাদের উঠান ঘিরে নেয় আমাদেরটা বাদ রেখে
দীর্ঘকালের বড় মজবুত পোক্ত বেড়া আমাদের

কয়েক পা এগিয়ে এসেই অকস্মাৎ
আমার ঠিক মনে পড়ে গেলো
ফেলে রেখে এসেছি মাস্কটা মুখের

পিপিলীকা পিছু নেয় বরাবর
আরেকটার, বিশ্বাস করে সবাইকে
কোথাও এগিয়ে যাই।

দুটো খুঁটি বরাবর টানা দিয়ে বাঁধা
দড়ি- কাপড় শুকোবার জানালার বাইরে আমার
এবং পাখিদের বিশ্রামাগার ক্ষণিকের

লেবু পড়ে রইলে
রাস্তার পাশে তুলে নেওয় হয়
আমার ফুল কুড়ানোর ডালায়

কেউ বা কোনো কিছুতেই
আমায় স্পর্শ করে না, তবে এই যে সবুজ বাতাস
তার শীতল সযতন পরশ, এর কথা ভিন্ন।

সান সেবাস্তিয়ান স্ট্রিটে / মার্টিন এসপাদা

ওল্ড সান জুয়ান, পুয়ের্তো রিকো, ১৯৯৮

এখানে সাধুসন্তের পথের একখানা বারে
সান সেবাস্তিয়ান স্ট্রিটে,
সাদা পোষাকে লাল রোমাল হাতে দাঁড়িয়ে এক নর্তক
সান সেবাস্তিয়ান স্ট্রিটে,
ক্রীতদাস কবলমুক্ত দেবতাদের ডাকে
সান সেবাস্তিয়ান স্ট্রিটে,
তার তামাটে চেহারায় ঘামের আলোক ছটা
সান সেবাস্তিয়ান স্ট্রিটে,
হাত চাপড়ায় কঙ্গোর ঢঙ্গে যেন মাঠ জুড়ে মশা মাছি
সান সেবাস্তিয়ান স্ট্রিটে,
স্মরণে আছে তার প্যাকেং বাক্সের তাল এবং লয়
সান সেবাস্তিয়ান স্ট্রিটে,
যেদিন থেকে কর্তাগণ খেদিয়ে দিলেন ঢাক-ঢোল
সান সেবাস্তিয়ান স্ট্রিটে,
আর স্বর্নালি তোতার মতো খ্যান খ্যানে তূরী-ভেরী
সান সেবাস্তিয়ান স্ট্রিটে,
ভেরী হলো অগ্রদূত, জানায় যুদ্ধ-সমাপ্তির ঘোষণা
সান সেবাস্তিয়ান স্ট্রিটে,
সৈনিক ছুড়ে ফেলে দেয় অস্ত্র দিক-বিদিক
সান সেবাস্তিয়ান স্ট্রিটে,
তখন সাধুটি নিজে অতি সহজে টান মারে তীরখানি আধখানা
সান সেবাস্তিয়ান স্ট্রিটে,
মোরগের নিখোঁজ পিতামহ পিতা সহ আসেন ফিরে
সান সেবাস্তিয়ান স্ট্রিটে,
আঙ্গুলগুলো টানছে আমার ইস্পাত-পশমি দাড়ি
সান সেবাস্তিয়ান স্ট্রিটে,
ফিসফিসিয়ে বলে তোমার দাড়িগুলো পাকা
সান সেবাস্তিয়ান স্ট্রিটে,
টেবিল জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ওদের রম
সান সেবাস্তিয়ান স্ট্রিটে,
যতক্ষণ না জ্ঞতি-গুতি জন তাড়িয়ে নিয়ে যায় বিছানায়
সান সেবাস্তিয়ান স্ট্রিটে,
এবং তামাটে চেহারায় সাদা পেষাকের নর্তক
সান সেবাস্তিয়ান স্ট্রিটে,
ঝড়ঝঞ্ঝার দেবতার মতো বৃষ্টি ঝেড়ে ফেলে চুল থেকে
সান সেবাস্তিয়ান স্ট্রিটে,
তারপর বুকের মধ্যে যে ঢোল বাজে তার রক্ত চেয়ে গান জোড়ে
সান সেবাস্তিয়ান স্ট্রিটে,
আর হাত ভরা রক্তে যে ঢাক-ঢোল বাজে তার প্রশস্তি গায়
সান সেবাস্তিয়ান স্ট্রিটে,
সান সেবাস্তিয়ান স্ট্রিটে।

বারবারা / জাক প্রেভের

মনে পড়ে বারবারা
ব্রিস্টে সেদিনটাতে বৃষ্টি হয়েছিল নিরন্তর
তুমি চলে গেলে হেসে হেসে
দীপ্ত, মোহনীয়, ভিজে জবজবে
বৃষ্টিতে।
মনে পড়ে বারবারা
অঝোরে বৃষ্টি সেদিন নিরন্তর ব্রিস্টে
সিয়াম স্ট্রিটে আমি গিয়েছি ছুটে তোমার কাছে
তুমি তাকালে হাসি হাসি মুখে
আমিও হেসেছিলাম।

মনে পড়ে বারবারা
তোমায় আমি চিনতাম না মোটেই
তুমিও কী চিনতে আমাকে,
মনে পড়ে,
আজও মনে পড়ে দিনটা স্পষ্ট
ভুলি নি এক চুলও
এক ভদ্রলোক বারান্দায় বেরিয়ে এসে কোনো মতে
চিৎকার করে ডাকছে তোমাকে
বারবারা,
আর, সেই বৃষ্টি মাথায় এক দৌড়ে তুমি চলে গেলে
দীপ্ত, মোহনীয়, ভিজে জবজবে
তুমি গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছ তার বাহুডোরে

বারবারা মনে পড়ে সে কথা
রেগে উঠো না যদি কিছু অবাধ কথা বলি,
আমি সচরাচর অবাধেই কথা বলি তাদের সাথে
যাদের আমি ভালবাসি
হয়তোবা তাদের দেখেছি কেবলই একবার
আর যারা প্রেম করে তাদের সবার সাথেই আমি
অবাধেই কথা বলি
এমনকি তাদেরকে হয়তো চিনি না জানি না
মনে রেখো বারবারা
ভুলো যেও না
সেই সুমধুর সুখের বৃষ্টির কথা
তোমার চোখে-নাকে-মুখে
সেই সুখের নগরীতে,
সেই ঝর ঝর ধারা সাগরের বুকে,
অস্ত্রাগারের ছাদে
উশান্তের যোদ্ধা জাহাজে

শোনো, বারবারা
যুদ্ধ যে কী চরম বোকামি
কী হয়ে গেছে তোমার
এই অয়ময় বৃষ্টিতে
অগ্নিময়, লৌহ ও রক্তে,
আর যে তোমায় কামান্ধ বহুবন্ধনে আটকে রেখেছিল
সে কি মারা গেছে নাকি চলে গেছে অথবা এখনো বেশ
বেঁচে বর্তে আছে

বারবারা, শুনছো
আজ সারাটা দিন ব্রিস্টেতে বৃষ্টি
আগেও যেমন হতো,
তবে এ-তো আর এক নয় কোনে মতেই,
সব কিছুই ম্লান হয়ে আছে,
এ তো বৃষ্টি শোকের, ভয়ংকর এবং নির্জনতার,
না, একে এখনো ঝড় বলা যাবে না
অগ্নিময় – লৌহ ও রক্তের,
নিছকই মেঘের বৃষ্টি
কুকুরের মৃত্যু বরাতে,
কুকুর যেমন দৌড়ে পালায় আড়ালে
মুশল ধারায় ব্রিস্টের ডুবে যাওয়া জলে
ভেসে বয়ে চলে যায় ক্ষয়ে যেতে
দীর্ঘ পথ ধরে কোনো কানা গলিতে,
বহু দূর, বহু দূর ব্রিস্টে ছাড়িয়ে অনেকটা দূরে
সেখানে এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

ক্ষুদ্র এক পাহাড়ী শহর / ইয়ে লিজুন

দক্ষিণের পাহাড়ী দঙ্গলে অতি ছোট এক গ্রাম
স্পষ্টতই চারটি ঋতু আর একটা নদী চিরন্তন বয়ে যায়
বনে বাগানে লাল শিখা জ্বেলে ওঠে দিনমনি জেগে, চারিদিক আলোর ঝলক
এহেন এক ছোট্ট শহরে স্কুলের মাস্টার আমি
স্কুলের বাড়তি একটা শ্রেণিকক্ষ
তক্তাপোশ একটা, আর একটা একটা করে টেবিল চেয়ার
স্কুল শেষে, আমার নিজের ঘরবাড়ি ঐটাই
গত দশটা বছর এই সাদা সিধে পথটাই আমার জীবন।
“তবে তো অন্য কিছু করতে পারো?“ বলে অনেকে
লজ্জায় আমার গালের দুটো পাশ লাল হয়ে ওঠে, জিবে কথা আটকায়
জানি না এমন কথার উত্তরে কী বলতে হয়
আসল কথা, আমি এই নির্জন নিরালায় থেকে থেকে বুড়িয়ে যাচ্ছি
নিত্যদিনের এই চর্বিতচর্বণ জীবনে ঘেন্না ধরে গেলো
জোড়ায় জোড়ায় নির্বোধ চোখগুলো দেখে দেখে। এতটা দিনে
বুঝেছি বেশ ভালো করে, আমার নিজের বেলায়
প্রকৃত শিক্ষায় হাতে খড়ি কভু কি স্কুলে হয়

ছোট শহর / জিল ওসিয়ার

শোনো, এই যে এখানে কম্বলটা ভিজে কারণ
আমি ছিলাম এখানেই। কেনো না
তোমার ঘরের দ্বার ছিল উদাম খোলা, আর আমি এখানে
এই গাছটার নিচে। ছিলাম কার‌ণ
বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল। কেনো না বৃষ্টি
এবং এই গাছটা, মানে দুটোই
তোমার বাড়ির পেছনে। কারণ, কারণ
আমি অমনই। কারণ তুমিও
ছিলে না বাড়িতে। মানে জানতান
তুমি গিয়েছো ক্লাবে। কারণ
যাচ্ছিলাম তোমারই রাস্তায়, কেনো না সে পথটা
তোমার বাড়ির পথ। আর আসল কথা
আমার একটু হাঁটার ইচ্ছে হলো। কেনো না
দেখলাম বৃষ্টি এলো বলে। কারণ তোমার বাড়ির দ্বার
কখনোই বন্ধ থাকে না।