ক্ষুদ্র এক পাহাড়ী শহর / ইয়ে লিজুন

দক্ষিণের পাহাড়ী দঙ্গলে অতি ছোট এক গ্রাম
স্পষ্টতই চারটি ঋতু আর একটা নদী চিরন্তন বয়ে যায়
বনে বাগানে লাল শিখা জ্বেলে ওঠে দিনমনি জেগে, চারিদিক আলোর ঝলক
এহেন এক ছোট্ট শহরে স্কুলের মাস্টার আমি
স্কুলের বাড়তি একটা শ্রেণিকক্ষ
তক্তাপোশ একটা, আর একটা একটা করে টেবিল চেয়ার
স্কুল শেষে, আমার নিজের ঘরবাড়ি ঐটাই
গত দশটা বছর এই সাদা সিধে পথটাই আমার জীবন।
“তবে তো অন্য কিছু করতে পারো?“ বলে অনেকে
লজ্জায় আমার গালের দুটো পাশ লাল হয়ে ওঠে, জিবে কথা আটকায়
জানি না এমন কথার উত্তরে কী বলতে হয়
আসল কথা, আমি এই নির্জন নিরালায় থেকে থেকে বুড়িয়ে যাচ্ছি
নিত্যদিনের এই চর্বিতচর্বণ জীবনে ঘেন্না ধরে গেলো
জোড়ায় জোড়ায় নির্বোধ চোখগুলো দেখে দেখে। এতটা দিনে
বুঝেছি বেশ ভালো করে, আমার নিজের বেলায়
প্রকৃত শিক্ষায় হাতে খড়ি কভু কি স্কুলে হয়

যাবৎজীবন দন্ডে

সাইত্রিশ বছর আগের প্রেম, শীলা,
তুমি তখন বড় শান্ত সর্বংসহা এক কিশোরী
প্রেমে যত অত্যাচার করা যায়
সবটুকু করেছি ঠিকই
কখনো ভাবি নি তোমাকে ছাড়াও আমার জীবন চলতে পারে
জীবন কী চলে এসেছে এতটা দূর?

বই থেকে যতবার মুখ তুলে
তাকাই জানালায়
দেখি খরতর রোদ
তাকাই দেয়ালে
সেখানে সাজানো থরে থরে বিরক্তি
আর ঘৃণা
কেউ দেখে না, ঝুলের মতো আগাছা হয়ে ঝুলে আছে
ঘরের এখানে সেখানে সর্বত্র
দরজায় দেখি
পালিয়ে বাঁচার বড় সড় বাঁধা
সে এক, একা বই
আর তাতে কালো কালো লক্ষ পিপড়ের মাঝে
ডুবে থাকি সারাক্ষণ
ভুল সুধরানো না গেলে
শাস্তি তুলে নিতে হয় নিজ হাতে
আমি লোকালয়ে বসবাস করেও
দ্বীপান্তরের শাস্তি নিয়েছি তুলে

তুমিও নিশ্চয়ই
দু-চারটে ছেলে মেয়ের রুক্ষ সুক্ষ্ম মা হয়ে
শাস্তি কাটছো যাবৎজীবন দন্ডে

ছোট শহর / জিল ওসিয়ার

শোনো, এই যে এখানে কম্বলটা ভিজে কারণ
আমি ছিলাম এখানেই। কেনো না
তোমার ঘরের দ্বার ছিল উদাম খোলা, আর আমি এখানে
এই গাছটার নিচে। ছিলাম কার‌ণ
বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল। কেনো না বৃষ্টি
এবং এই গাছটা, মানে দুটোই
তোমার বাড়ির পেছনে। কারণ, কারণ
আমি অমনই। কারণ তুমিও
ছিলে না বাড়িতে। মানে জানতান
তুমি গিয়েছো ক্লাবে। কারণ
যাচ্ছিলাম তোমারই রাস্তায়, কেনো না সে পথটা
তোমার বাড়ির পথ। আর আসল কথা
আমার একটু হাঁটার ইচ্ছে হলো। কেনো না
দেখলাম বৃষ্টি এলো বলে। কারণ তোমার বাড়ির দ্বার
কখনোই বন্ধ থাকে না।

বাড়িগুলো সব উল্টে গেলো

গ্রামে দেশজ বাড়িতে, বাগান হয়ে
উঠোন পেরিয়ে বারান্দায় উঠে এসে
ঘরে ঢুকতে হতো।
শহরের ফ্ল্যাটে ড্রেন টপকে দুধাপ উঠে পার্কিংলট
তা পেরিয়ে ঘরে ঢুকে বারান্দা, বাগান

আমরা খেলতে ছুটতাম বাইরে, মাঠে
ওরা জায়গাটাকে ফাঁকা রেখে
ঘরের ভেতরেই পাঠিয়ে দিয়েছে মাঠটাকে
বাচ্চারা আজ বেদম ছোটে এবং ছোটায় ভারচুয়াল গাড়ি
বাস্তবে, কেউ ওখানে তুলছে বাড়ি বা শপিং মল

শহর, মানে মাথা গোঁজার জায়গাও বটে
তবে করে খাওয়ার পথটাই আগে

লিপোর দুটো কবিতা

বৃষ্টি শেষে চাঁদের রূপ দেখে

জমাট কালো মেঘ ভেঙ্গে বাতাস ছুটেছে ঐ
আরো একবার চোখে পড়ে বিস্তর দিগন্ত নগরীর পিছে চৌদিক
খোলো দরজা। চাঁদের বুড়ি বেরিয়ে এসেছে আধা পথ
তার ঝিলিক, কোমল দধির ছড়িয়ে আকাশময়
নদীগুলোসব নাবাল জলাভূম চিক চিকে অলঙ্কার
চাঁদ, উঠছে, যেন পাহাড়ের স্বেত চক্ষু
মাথার উপরে এসে সে সাগরের হৃদপিন্ড
আসল কথা, আমি চাঁদ বড় ভালবাসি, ঐ গোলপানা চাঁদ
গুন গুনিয়ে গান করি জেগে সারা রাত

গ্রীষ্মের একদিন পাহাড়ে

আলতো দোলায় নাড়ছি আমি পালক পাখা
জামা খুলে বসে আছি সবুজ বনে
মাথাল খুলে ঝুলিয়ে দিলাম কাল পাথরে
পাইন-গাছের বাতাস এসে দোলে আমার
আদুল মাথায়

ভ্রান্তির পাপ, কেরল লাইট

ভুলে থাকার ভান করেছি
প্রথম প্রথম আনমনা তারপর পালিয়ে থাকা তারপর এড়িয়ে চলা

নীলাকাশে কিসের ক্লেশ?
কেনো মেঘ, কেনো বজ্রনিনাদ?

থর ছুড়ে ফেলেছেন হাতের হাতুড়ি
তাঁর ষাড় ছুটে চলেছে মাঠ-ঘাট পেরিয়ে

বন-জঙ্গল তার গাছের আড়ালে লুকিয়ে রাখা
গাছ দাঁড়িয়ে সত্যোর ভিতর শিকড় গেড়ে

সত্য চুঁয়ে পড়ে অনুতাপ কষ্ট
আমরা তো সব কাষ্ট একে অপরের সাথে

মানুষ অতীতটা ভাবে স্বর্গের দিকে চোখ তুলে
আর মিথ্যে কথা বলে নজর ঘুরিয়ে রেখে

নয়তো? আশা করি পন্ড বা কোনো ভন্ডামী করি নি
আশা করি আশাাম্বিতও করি নি

সত্যের একাংশ। চলে আসবার আগে সামান্য আঁচড়
বহু আগে। আদতে নিছকই জানা কতটুকু আমার দেনা